দীন মহম্মদ-এর ভারত ভ্রমণ গ্রন্থের দুটি চিঠির অনুবাদ-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়

330px-Sake_Dean_Mahomed

Sheikh Din Muhammad  was a Bengali Anglo-Indian traveller, surgeon and entrepreneur who was one of the most notable early non-European immigrants to the Western World. It was him to introduce the South Asian cuisineand the shampooing baths in Europe, where he offered therapeutic massage. He was also the first Asian to have written a book in English in 1794.

দীন মহম্মদের উপরোক্ত বইটির থেকে নেয়া তিনটি চিঠির অনুবাদ।

পত্র – ১২

শোভাযাত্রা চলে যাবার পরপরই আমার এক আত্মীয়ের সংগে দেখা, তিনিও মুসলমান; আমাকে তার ছেলের সুন্নত এ উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানালেন। এই অনুষ্ঠানের বিবরণ দেবার আগে আমার বলে নেওয়া উচিত যে মুসলমান ধর্ম অনুযায়ী তিনবার একটি শিশুকে দীক্ষিত করা হয়। প্রথম, জন্মের সময়, এক হিন্দু ব্রাহ্মণ দ্বারা; যদিও তিনি অন্য ধর্মের তবুও জ্যোতিষশাস্ত্রের পান্ডিত্যের জন্য তাদের অত্যন্ত মান্যতা দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে জ্যোতিষবিদ্যা অনুসারে স্রেফ তার নামকরণ হয় আর বাবা মা আত্মীয়স্বজন সকলেই ব্রাহ্মণবিদায় দিয়ে থাকেন।

দ্বিতীয়বার বাচ্চার চার দিন বয়েসে। এবারে একজন কাজি বা মৌলানা জন্মের পর বাচ্চা আর তার মাকে দেখতে আসা আত্মীয়-মহিলাদের উপস্থিতিতে আলকোরান থেকে পাঠ করে পবিত্র জল ছিটিয়ে দেন গায়ে মাথায়। তারপর জাতককে সরষের তেল মাখিয়ে দেন, বিশেষত নাভি আর কানের লতিতে। একইভাবে তারপর জেনানা মহল থেকে বেড়িয়ে মৌলানা পুরুষদের কক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি চলে গেলে নাই, অর্থাৎ নাপিতের বাড়ির মেয়েরা বাচ্চার মায়ের কাছে আসেন। কেউ নখ কেটে দেন। কেউ হাত-পা ধোয়ার জন্য জল এগিয়ে দেন, কেউবা পোষাক পরানোর কাজটা করেন। অভিজাত মহিলারাও দেখতে আসেন, মাকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি দ্রুত সুস্থ হবার কামনা ও শুভেচ্ছা জানান। মায়ের কোল ভরে তাজা ফল উপহার দেন তারা, যা প্রাচুর্যের প্রতীক। এসব শেষ হলে আদর আপ্যায়ণ চলে। বাড়ির কাজের মহিলাদের প্রস্তুত করা খাবার-দাবার নাইয়ের বাড়ির স্ত্রীলোকেরাই পরিবেশন করেন। মূলত কেক আর নানান রকম মেঠাই। পুরুষ মানুষেরা এসে বাচ্চার বাবাকে অভিনন্দন জানান, বাচ্চার মঙ্গল কামনা করেন। দ্বিতীয়টা এইভাবে পালন হবার পর তৃতীয়বার হয় বাচ্চার জন্মের বিশতম দিনে। একইরকম অনুষ্ঠান, শুধু দিনের তফাত এই যা।

মুসলমানেরা সাত বছর বয়েস না হওয়া অবধি সুন্নত করে না, যাকে বলা যায় চতুর্থবারের দীক্ষা। আর নিয়ম নিষ্ঠায় এমনভাবে সেটা ধর্মের নিগড়ে বাঁধা যে ওই কচি বয়েসেও বাচ্চা বুঝতে পারে কি করা হচ্ছে ও কেন করা হচ্ছে। গরীব মানুষেরা অবধি এই অনুষ্ঠানের বেশ আগে থেকে খানিকটা কষ্ট করেই টাকা পয়সা সাশ্রয় করেন যাতে মোটামুটি জাঁকজমক করে লোকজন ডেকে অনুষ্ঠান করতে পারেন। আর এমন অনুষ্ঠানে আপ্যায়ণের যেন কোনোই খামতি না থাকে। অনুষ্ঠানের আগেই নাপিত সম্প্রদায়ের মানুষদের ডাক পরে। উর্দুতে এদের বলা হয় হাজাম। তারা মুর্শিদাবাদের সমস্ত বেরাদরীর লোকেদের সাথে সুপরিচিত, ফলে আপ্যায়ণের কাজটা তারাই সুষ্ঠুভাবে করেন। আপ্যায়ণ করা হয় সুপুরি বা হরিতকী জাতীয় ফল দিয়ে। ইয়োরোপে যেমন কিনা কার্ডের প্রচলন।

বড়ো মসলিনের সামিয়ানা খাটানো হয় বাড়ির লাগোয়া ফাঁকা উঠোনে, যেখানে কমবেশি হাজার দুয়েক লোক ধরে যাবে। অতিথিরা এসে জড়ো হবেন সেখানে। সামিয়ানার পোলগুলো বেশ মজবুত আর তার ধারগুলোও মসলিনের তৈরী। তবে হ্যাঁ মুসলমান ছাড়া অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই সেখানে। মৌলানা আসতেই সংগীত বাদ্য শুরু করে দেবে সামিয়ানার নিচে বসে থাকা বাজনদারদের দল। একজন হাজাম তাকে আপ্যায়ণ করে নিয়ে আসবেন বাচ্চার কাছে। ছেলেটিকে সাজানো হয় মনিমুক্তো খচিত লাল মসলিনের কাপড় দিয়ে। বসানো হয় ঢাকা একখানা হাতওয়ালা সিংহাসনের মতো চেয়ারে। চারপাশে ভেলভেটের কুশন দিয়ে। সেখান থেকে চারজন লোক তাকে একসময় নিয়ে বসায় ঘোড়ার ওপর। চারজনেই, ছেলেটির নিকট আত্মীয়, লাল মসলিনের পোষাক তাদেরও পরনে আর প্রত্যেকের হাতে একখানা খোলা তলোয়ার। অবস্থাপন্ন মুসলমানেরা এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলিকে আরও চমকপ্রদ করে তোলেন। ঘোড়ার পিঠে চড়ে, সুসজ্জিত উটের সারি নিয়ে উপস্থিত হন তারা। সকলের সাথে এভাবে খুব জাঁক করে ছেলেটিকে পবিত্র উপাসনাস্থলে নিয়ে আসা হয় এবং বহনকারী চারজনের সাথেই সে একযোগে প্রবেশ করে। যাজকের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে মা বাপের শেখানো মন্ত্র বা সুরাপাঠ করে; সেটা অবশ্যই প্রার্থনার মন্ত্রবিশেষ আরকি! সেসব শেষ হলে আবার ঘোড়ার পিঠে উঠে মসজিদেরই অন্য একটা উপাসনা কক্ষে যাওয়া হয়, আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং এবার নিষ্ঠাভরে সমবেত প্রার্থনা। যাতে মহান আল্লা বাচ্চাটিকে আসন্ন সুন্নতের যাবতীয় বিপদ থেকে রক্ষা করেন।

নানান উপাসনাগৃহ ঘুরে টুরে সামিয়ানার নীচে ফিরে এসে ঝলমলে চাঁদোয়ার নীচে ফের ছেলেটিকে সিংহাসনে বসানো হয়। মৌলানা তার ধার্মিক পোষাক পরে ঢুকে পড়তেই এবারে বাজনদারদের বাজনা থেমে যাবে; তিনি তার হাতের পাত্র থেকে মন্ত্রপূত জল ছেটাবেন। এক হাজাম সুন্নতের জন্য ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বেশ দ্রুততার সংগে কাজটি করেও ফেলবে। এসময় বাপ মায়ের সঙ্গে সমবেত সকলে একমন হয়ে আল্লার কাছে প্রার্থনা জানায় যাতে ছেলেটি সুরক্ষিত থাকে। বাজনা আবার শুরু হয় এবং আনন্দের একখানা সুর বাজতে থাকে। এরপর ছেলেটিকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়। হাজামদের দেওয়া জলে হাত টাত ধুয়ে মুছে দামী কার্পেটের ওপর বসে খাওয়া দাওয়া শুরু হয়। খাবার মূলত পুলাউ। এদেশীয় লোকেদের কাছে এটি খুব জনপ্রিয় ও সুস্বাদু খাবার, বানানো হয় চাল ও বিশেষভাবে প্রস্তুত মাংস মিশিয়ে। মশালের আলোয়, চকচকে গয়নাগাঁটির প্রতিফলিত  আলোয় সমস্ত পরিবেশটাই উজ্জ্বল ও অপরূপ হয়ে ওঠে।

পত্র – ১৩

এবারে আপনাকে মুসলমান সমাজের বিয়ের ব্যাপারে জানাব। উপমহাদেশে এই ধরনের বিয়ে মানে দারুণ আড়ম্বর ও জাঁকজমকের অন্যতম নিদর্শন। পাত্র পাত্রীর বাবা মা অভিভাবকেরাই যাবতীয় কথাবার্তা চালাচালি করেন, আর দুপক্ষই রাজি থাকলে ব্যাপারটা বিয়ে অবধি গড়ায়। তবে বিয়ে স্থির হলেও আগেভাগে ছেলেমেয়েদের দেখা করার, কথা বলারও কোন সুযোগ থাকে না। একেবারে অল্প বয়েসেই বিয়ের ব্যাপার স্যাপার সেরে ফেলা হয়। মেয়েটির বয়েস হয়তো মেরে কেটে বারো, ছেলের বয়েস খানিকটা বেশি। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই তাদের  জাতি কূল একই হতে হবে। যেমন তাঁতী তার মেয়েকে অন্য বৃত্তির লোকের ঘরে বিয়ে দেবে না। প্রকৃত প্রস্তাবে প্রত্যেক পক্ষই ভাগ্য বদল চান; চান সুদিন, এই বিবাহের মধ্য দিয়ে। মধ্যবিত্ত ঘরে মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি থেকে শাড়ি জামাকাপড়ের থেকে শুরু করে গয়নাগাটি, আসবাব এসব দেওয়া হয়, আর ছেলেটিকে যার যার সাধ্য মতো জমি, বা ব্যবসার অংশ। সব কিছু ঠিকঠাক মনোমতো হলে হাজামদের পাঠানো হয় পান সুপারি নিয়ে বন্ধু বান্ধব আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করার জন্য। দুপক্ষের বাড়িই সাজানো হয় গাছের লতাপাতা আর ফুল দিয়ে। বাইরের দরজায় গাইয়ে বাজিয়েদের নহবৎ বসে। তাদের পায়ের কাছে নীচু তলার লোকেদের বসার ব্যবস্থা। সমাজে যাদের সাথে খোলাখুলি ঘনিষ্ঠ মেশামেশিতে বাধা। আমন্ত্রিত অভ্যাগতরা আনন্দিত মনে উপস্থিত হয়ে দেখতেন সবুজ ডালপালা আর ফুল দিয়ে সুসজ্জিত বাড়ি। তাদের সাজগোজ করা চেহারা অচিরেই অনুষ্ঠানের শোভাও বাড়ায়। গোটা সপ্তাহ হুল্লোড় আর বন্ধুত্বপূর্ণ আমোদ ফুর্তিতে কাটে। বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের জন্য আর তাদের আত্মীয়দের জন্য সবচেয়ে ভালো লাল মসলিন কেনেন দুতরফের থেকেই। এ পক্ষ পাত্রীকে আর সেবাড়ির মেয়েদের পোষাক পাঠালে পাত্রীপক্ষও এ বাড়ির ছেলে আর তার আত্মীয়দের যথাবিহীত পোষাক আশাক উপঢৌকন দেন।

এমনিভাবে সাজিয়ে গুজিয়ে বরবউকে পালকিতে চড়িয়ে নিয়ে আসা হয় মেয়ের বাড়ি। সঙ্গে মশাল বাহকের দল। মেয়ের বাড়ির লোক রাস্তাতেই তাকে অভ্যর্থনা করে। বর এসে পৌঁছলে অনুষ্ঠান শুরু। অনুষ্ঠানবাড়ি বড়োসড় হলে ঠিক আছে নইলে যা করা হয় প্রতি ক্ষেত্রেই, একটা বিরাট সামিয়ানা টাঙানো হয় উঠোনে। তার মাঝামাঝি সাতফুট উঁচু একটা চাঁদোয়া, সাদা মিহি মসলিন দিয়ে সাজানো। ভেতরের দিকে নানান ছবি আঁকা, সূর্য চাঁদ তারা এইসব। এই চাঁদোয়ার নীচে নরম কুশনের ওপর লাজুক বউ আলগোছে বসে আর উল্টোদিকে তার বর, আসন্ন বিয়ের উত্তেজনায় অধীর। দুলহা দুলহন একই ভঙ্গীমায় বসে। ইতিমধ্যে সানাইয়ের সুর মৌলানার আগমন ঘোষণা করে; মৌলানা তার শান্ত সমাহিত ভঙ্গীতে প্রবেশ করেন। সানাই থেমে এল আস্তে আস্তে, নীরবতা নেমে এল চারপাশে। মৌলানা এবারে আলকোরান খুলে ধরেন। প্রথামতো চার কোনায় চারজন সেই পবিত্র গ্রন্থ ধরে থাকে আর তিনি গভীর স্বরে পাঠ করতে থাকেন। বর কনের মধ্যে আংটি বদল হয়, একে অন্যের আঙুলে পড়িয়ে দেয়। এসময় পাত্রীপক্ষের একজন মহিলা পেছন থেকে এসে, ঘোমটা মোড়া বর কনের শালের কোন দুটো নিয়ে শক্ত করে গিঁট বেধে দেন। একে গাঁটছড়া বলে, বিবাহিত জীবনের বন্ধন। মৌলানা ধর্মীয় রীতি মেনে একটি গ্লাসে জল ও চিনির মিশ্রন নিয়ে বরকনের হাতে দেন। তারা একে একে তাতে চুমুক দেবার পর বিশিষ্ট বন্ধু আত্মীয়-পরিজনদের দিলে তারাও একে একে ঠোঁটে ঠেকান পাত্রটা। সকলেই বরকনেকে শুভকামনা জানান এবং এরপর এলাহি খানাপিনা। খাওয়া দাওয়া শেষ হলে নাচিয়ে মেয়ের দল আসে আসরে। সিল্ক, মসলিন কাপড়ের পোষাকে উজ্জ্বল ও মনোহারী তাদের বেশ। আমোদ প্রোমোদ শেষে বড়ো রুপোর থালায় সকলেই কিছু কিছু মুদ্রা দেন হাজামদের পারিতোষিক হিসেবে। তারপর সকলে  বাড়ি ফেরেন।

বর বউ আলাদা পালকিতে করে বরের বাড়ি চলল। সামনে বাজনদার আর মশালবাহকের দল। রাতের অন্ধকার দশা যেন কেটে যাচ্ছে আলো আর সংগীতে এমনই তার আমেজ আর তার সাথে সাথে আতশবাজি। আকাশে কত রকম যে রোশনাই। বাড়ি পৌঁছনোর পর মৌলানা তাদের আশির্বাদ করে, সকলের ওপর সুগন্ধি আতর ছড়িয়ে দেন। সেখানে দ্বিতীয় দফার আমোদের ব্যবস্থা থাকে ইয়ার দোস্তদের জন্য আর এভাবেই শেষ হয় বিয়ের উৎসব।

উচ্চঘরের লোকেদের বাড়িতে, যারা বেশ অবস্থাপন্ন,  ব্যবসাদার কিংবা ব্যাপারিদের বাড়িতে, বিয়ের পর মহিলাটি আর বাইরে বেরোন না। বেরোলেও পালকি চড়ে পর্দানশিন হয়ে। ভারতে যেকোনো সামাজিক অবস্থানের লোকই বিয়ের পর সাতদিন অন্তত বাড়িতেই থাকেন, বাইরে ঘুরে ঘুরে বেড়ান না, আর জনসমক্ষে স্ত্রীর উপস্থিতিকে তারা সকলেই খুবই অসম্মানজনক মনে করে। দরিদ্র জনগনকে অবশ্য এই পর্যবেক্ষনের বাইরে রাখছি। স্বামীর মৃত্যুর পর তার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারিনী হন স্ত্রী। এখানে লক্ষ্যনীয়, হিন্দু হোক বা মুসলমান, কেউই জনসমক্ষে স্ত্রীর উপস্থিতির ব্যপারটা মেনে নেয় না, কার্যত তেমন প্রস্তাবে কোনো আমলই দেয় না। স্ত্রীদের তারা এতটাই পবিত্র ও রক্ষ্যনীয় মনে করেন, যে সৈনিকেরাও মারকাটারির সময় তাদের ছুঁতে কিন্তু কিন্তু করেন। বস্তুত গায়ে হাত দেন না। এমনকি সময়তে তাদের রক্ষা করেই চলেন। যুদ্ধের বীভৎসতার বিপরীতে হারেম যেন একটা শান্তির উপবন। স্বামীর রক্তে মাখামাখি সৈনিকও সেই স্ত্রীর ঘরের সামনে এসে কুঁকড়ে যান, চৌকাঠ ডিঙোতে ইতস্তত করেন।

পত্র – ১৪

মুসলমানরা সাধারণত সুস্বাস্থের অধিকারী। কড়া পানীয় থেকে দূরে থাকেন, হাল্কা খাবারে অভ্যস্ত। রোগজ্বালা আছে তবে তার সাধারণ অথচ অব্যর্থ দাওয়াইও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তাদের জানা। রোগে আক্রান্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেন মূলত এই ভেবে যে ঘরোয়া দাওয়াই দিয়েই রোগ ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অসুখ বাড়াবাড়ি হলে, যখন কোনোকিছুতেই আর কিছু হচ্ছে না, মৌলানার ডাক পড়ে। মৌলানা এসে রোগীর বিছানার পাশে বসেন, তার আক্রান্ত অঙ্গটির ওপর হাত রাখেন, আর ঈশ্বরের কাছে একমনে প্রার্থনা করে থাকেন। বিশ্বাস এই যে এভাবেই দ্রুত আরোগ্যলাভ সম্ভব। মুসলমান ধর্মের মানুষেরা অসাধারণ মনের জোর ও বিশ্বাস থেকে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তারা বিশ্বাস করেন পার্থিব  বন্ধন থেকে অবারিত অনন্ত সুখের দিকে যাবার চাবিকাঠি এটাই। রোগগ্রস্ত মানুষের কাছে এটা বিরাট সান্ত্বনা। চলে যাবার মুহূর্তে নশ্বরতা থেকে মুক্তি পাবার আকাঙ্ক্ষা আর অমরতার প্রত্যাশায়, দেবদূতের হাসির মধ্যে পরম শান্তির দেশে যাওয়া।

কোনো মানুষের মৃত্যু হলে একই ধর্মের মানুষেরা মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজনদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন, সান্ত্বনা দেন। সাদা মসলিনের ওপর মৃত ব্যক্তিকে শোয়ানো হয়, ফুল দিয়ে সাজান হয় তার বিছানা, মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, সাদা কাপড়ের পর্দা টাঙানো হয় চারধারে। সকলে মিলে জড়ো হয়ে প্রার্থনা করেন আত্মার শান্তিকামনায়, আর চব্বিশ ঘন্টা পর মসলিনে মুড়িয়ে তাকে কবরখানাতে নিয়ে যাওয়া হয় সমাধির আগে। সেখানে যারাই সমবেত হন, মহান আল্লার কাছে তাদের প্রার্থনা থাকে মৃত আত্মার শান্তি কামনায়। নিঃশব্দে তাকে কবরে শুইয়ে দেওয়া হয়, নিকটাত্মীয়েরা মাটি দেন। মৌলানা একটু একটু মন্ত্রপুত রুটির টুকরো সকলকে বিতরণ করেন। সকলেই সমবেত প্রার্থনায় জড়ো হন সেখানে। মৃতের বড়ো ছেলে পবিত্র জল ছিটিয়ে দেয় কবরে আর সাদা কাপড়ে ঢেকে দেয় সেটা। চারদিন পর আত্মীয়েরা পাড়া প্রতিবেশীদের আপ্যায়ণ করেন, কাঙালিভোজন করান। গরীব মানুষের দোয়া লাগে মৃতের আত্মার মঙ্গলকামনায়।

অবস্থাপন্ন লোকেরা মৃতের স্মৃতিতে ফলক বা সৌধ নির্মান করেন। কবরে প্রদীপ জ্বালান। তাদের বাড়িতেও কোনো অনুষ্ঠানের দিন তার স্মৃতিতে আলো দিয়ে সাজানো হয়। গরীবেরা শুধু কবরেই এই প্রদীপ জ্বালানোর কাজটা করে থাকে। বছরে অন্তত একবার । স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীরা গয়নাগাঁটি খুলে রাখেন। সাধারণ সাদা শাড়ি পড়েন আর মাঝবয়েসে এসে সমস্ত সম্পত্তির অধিকারিনী হন। অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের জন্য সামান্য কিছু রেখে সম্পত্তির অংশ সন্তানদের মধ্যে ভাগও করে দেন। একটু উচ্চঘরে ছেলে বাবার জায়গা নেয়, সংসারের কর্তা হয়ে বসে।

নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসে মুসলমানেরা খুবই নিষ্ঠাবান। সাধারনের মধ্যে ধারণা যে মহম্মদের ভজনাও এই ধর্মপালনের অংশ;  তা নয়, আসলে তার চেয়ে অনেকই বেশী, সর্বশক্তিমান মহান আল্লার সঙ্গে একীভূত হওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য। মহম্মদ আসেন তার পরের ধাপে, সেই মহামিলনের প্রথম ও অন্যতম যাজক। আরবদেশে মূর্তিপূজা বন্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়ে, মহম্মদকে কোনো দেবতার আসনে বসিয়ে তাকে পূজা নয়, বরং একজন সর্বশক্তিমানের প্রতিনিধি হিসেবেই দেখা হয়। যদিও ভ্রান্ত তবু সাধারনের একটা ধারনা,মহম্মদের সমাধিক্ষেত্রে যাত্রাই বাৎসরিক তীর্থযাত্রারূপ। প্রকৃত যাত্রা অবশ্য কাবা বা মক্কার পবিত্র সৌধটির উদ্দেশে। ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্য নিয়ে যে সৌধ হজরত মহম্মদই উৎসর্গ করেছিলেন। হজরতের সমাধিটি আসলে মদিনায়। সেখানে মুসলমান ধর্মে বিশ্বাসী লোকেরা যান তাদের অন্তরের শ্রদ্ধা জানাতে।  তার অনুসরনকারী ভক্তেরা সর্বশক্তিমানের জন্য শ্রদ্ধা জ্ঞাপন তো করেনই। এর পাশাপাশি সাধারনভাবে ঈশ্বর বা আল্লাহ এর অবয়ব চিন্তা তো নয়ই, বরং তাকে ভাবা হয় অসীমবিস্তৃত প্রশংসার অতীত এক অস্তিত্ব, ভাষায় যিনি ব্যাখ্যাতীত। শ্রদ্ধাটা এমন পর্যায়ের যে, এই অসীম অস্তিত্বের জন্য – ভালো, ন্যায়নিষ্ঠ, দয়ালু এসব বিশেষণও খেলো ও ঠুনকো মনে হয়। ভাবখানা যেন একজন মানুষের সম্পর্কে বলা যে তার একটা মাথা আছে , বা অন্য কোনো অঙ্গ, কান, নাক যা মানুষের দেহ ধারনে অবশ্যম্ভাবী। তারা ভাবেন মানবিক গুনাগুন দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করলে ঈশ্বরের অবমাননা হয়। কোনো ভাবনাই সেই অনন্তের প্রকাশ ব্যাখ্যায় যথেষ্ট নয়, কোনো বিশেষণই সেই সর্বোত্তমের, সেই একক অস্তিত্বের একবিন্দু অতিরিক্ত বর্ননা করতে পারবে না।

অনুবাদকের সংযোজনঃ দীন মহম্মদ সামাজিক আচার আচরণ, প্রথাপালনের এবং বিশ্বাসের যা বর্ণনা করেছেন ওপরের চিঠিগুলিতে তা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য প্রযোজ্য। এমনটা হতে পারে তিনি তার নিজের অঞ্চলের প্রচলিত আনুষ্ঠানিক রীতিনীতিই উল্লেখ করেছেন। তার সঙ্গে মিশেছে মুর্শিদাবাদে কাটানো সময়কালে  সেই অঞ্চলের কিছু আচার আপ্যায়ণ পদ্ধতি। স্থানভেদে ও কালভেদে একই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এই অনুষ্ঠানগুলির রীতিনীতি, প্রথাগত আচার বদলে যেতে থাকে। যেমন দক্ষিণ ভারতীয় মুসলমান ও উত্তর ভারতীয় মুসলমান সমাজে এই সামাজিক অনুষ্ঠানগুলির প্রথায় অনেকই প্রভেদ। এই আচার বর্ণনা সম্পর্কে এইই বলা যায় যে এটা সেই সময়কার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মুসলমান ধর্মের মানুষের ব্যবহৃত রীতিনীতি যা দীন মহম্মদ দেখেছিলেন। এটাকে সমগ্র মুসলমান সমাজের অভ্রান্ত এবং অপরিবর্তনীয় রীতি বলে মনে করার কারন নেই। বর্তমানে একই শহরের মধ্যে আলাদা আলাদা শ্রেণির মানুষের মধ্যে আলাদা আলাদা আচার অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে, যদিও গ্রামে এতটা প্রভেদ থাকে না। সেখানে মোটামুটি একইরকম প্রথায় আচার অনুষ্ঠান চলে। জাঁকজমকেই খালি যা তফাত হয়।

 

পত্র ১৫

এবারে সমাধি থেকে একটু হৈচৈ এর দিকে তাকাই। এদেশের নর্তকীদের সম্পর্কে কিছু কথা বলি, আশা করি আনন্দ পাবেন। নাচ গানে ছোটো থেকেই এদের পারদর্শী করে তোলা হয় একজন বয়স্কার তত্ত্বাবধানে। বিনিময়ে তাদের রোজগারের ভাগ পান ওই মহিলা। নর্তকীদের কী পোষাক আশাকে আরও আকর্ষণীয় দেখাবে তাও এরই হাতে থাকে। একাধিক বসতি এদের । কখোনো শহর বা গঞ্জের চমৎকার সব সুন্দর সুন্দর বাড়িতে, কখোনো আবার বছরের মনোরম ঋতুতে গ্রামের বাগানবাড়ি অথবা গাছপালা বাগান ঘেরা প্রাসাদে। শহরের সমস্ত বিলাসের উপকরন সেখানে মজুত। যে কেউ, এমনকী নিস্পৃহ লোকও উৎসাহিত হয়ে পড়বে ব্যাবস্থাপনা দেখে। এখন মুখ্য নবাবেরা, উচ্চপদস্থ ইউরোপীয় ভদ্রমহোদয়রা এদের বায়না দেন, মূলত আনন্দউৎসবের জন্য। সমাজের বিভিন্ন জাতি বা স্তর থেকেই এই নাচিয়েদের আগমন, সেসব ধর্তব্যের বিষয় নয় যদিও। মুখ্য হয়ে ওঠে এদের স্বাভাবিক এবং শিক্ষিত মাধুর্য।

নানাবিধ বাদ্যযন্ত্রের সাথে এরা নৃত্য পরিবেশন করেন। নাচের মধ্যে অভিনয়ও ফুটে ওঠে। নাচের মধ্যে পায়ের তাল , নানান অঙ্গভঙ্গী, এবং আবহ তৈরী করেন। সবচেয়ে যেটা লোকপ্রিয়, সেটা নাচের মধ্যে দক্ষ অভিনয় ক্ষমতা। নাচের অনুষ্ঠান, আমজনতার মাঝে এবঙ্গ বযক্তিগত পরিসরে দুরকমই হয়। ব্যক্তিগত নাচের বরাতে তাদের অভিব্যক্তি আরও সূক্ষ্ম হত। তাদের এই অভিব্যক্তির দক্ষতা প্রশ্নাতীত, আর এর ওপরে নির্ভর করেই তাদের ভাগ্যও খুলে যেত। দক্ষ অভিনেত্রীরা, গাইয়েরা এভাবেই বহু সম্পদের অধিকারী হন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এদেরই পয়সায় অনেক মুসলমানি দরগা নির্মিত হয়েছে। সমৃদ্ধ কারখানা গড়া হয়েছে যাতে নানা বৃত্তির দক্ষ কারিগরী শিল্পিরা কাজের সুযোগ লাভ করেন।

দেশের নানান প্রান্তের বৈশিষ্ট অনুযায়ী এই নর্তকীদের একেকরকম পোষাক। কিন্তু একটা বিষয়ে সকলেই এক তা হল উৎকর্ষতা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত অলঙ্কার। পায়ের আঙুলেও আংটি পরেন এনারা। গলায় হার, হাতে বাজুবন্ধ, পায়ে পাথর বসানো কারুকাজকরা সোনারুপোর মল। নাকে নথ। এ এমন একধরনের গয়না, যাতে চট করে নজর যাবে। সাটিনের, মসলিনের তৈরী পরনের কাপড়ে জরি, জহরত বসানো । সেসব পোষাক যেমন নরম তেমনি আকর্ষণীয়। গলায় মোটা জুঁইয়ের মালা; যেমন তার গন্ধ, দেখামাত্র মোহিত হতে হবে, কৃত্রিম সুগন্ধি কোথায় লাগে। দারুন মখমলি সাদা গাউনের পোষাক, রুপোলি ধারের কাজ করা বিরাট ঘেরের ঘাগড়া, সিল্কের মসৃণ পাজামা, আর বড়ো বহরের শাল। তাতেও রুপোর কাজ। মাথায় চুনি পান্না আর ফুলের সাজ। বিনুনি বাধা লম্বা চুল। মোঘল আর মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের সঙ্গে যাদের ওঠাবসা বেশি , সেসব বেশিরভাগ মহিলারাই, প্রাচ্যের পুরোনো প্রথা মেনে চলেন। তারা চোখে কাজল লাগান, টানা টানা করে, একধরনের ধূসর রঙা পাউডার লাগান চোখের পাতায়, দুদিকেই। একে সুরমা বলে। কাজলের কালোর পাশে সুরমা চোখকে শুধু উজ্জল করে তাই নয়, তাদের বিশ্বাস সুরমা চোখ পরিষ্কার ও ঠান্ডা রাখে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক পাতানোর চেয়ে প্রকৃতিকে অনুসরণ করাই এরা শ্রেয় মনে করেন। কেননা প্রকৃতির কোল থেকেই এদের শিল্পের যাবতীয় উদ্ভব। তাদের ব্যবহার মার্জিত ও নমনীয়। ইওরোপের নটিদের মতো অতটা হায়ালজ্জাহীন উদ্ধত নন এরা। এরই মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন যারা সংগীত বা অন্যান্য কলাবিদ্যায় উজ্জ্বল সাক্ষর রাখেন বা রেখেছেন।

এমনই একজন গুণী মানুষ কিছুকাল আগে কাশিমবাজার অঞ্চলে থাকতেন। বেশ কিছু উচ্চ পদমর্যাদা ও  বিশিষ্ট মানুষেরা এর অনুরাগী ছিলেন। এদের মধ্যে একজন ধনী ব্যক্তি তার প্রতি এমনই মোহিত হলেন, যে তার ব্যবসাপত্র প্রায় বন্ধ হবার যোগাড় হল। ভয়ে প্রিয় মানুষটিকে বলতেও পারছেন না, পাছে তার দেউলে হবার খবরে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন!! বহু অনুনয় বিনয়ের পর ব্যবসায়ী ওই মহিলাকে গোড়া থেকে সব খুলে বললেন। শোনবার মাঝেই ভদ্রমহিলা দুম করে উঠে গেলেন এবং বেশ ভালো পরিমান টাকা ও নিজস্ব জিনিসপত্র এনে দিলেন ওই ব্যক্তিকে যাতে তিনি নতুন উৎসাহে আরো বড়ো আকারে ব্যবসা করতে পারেন।

এটা একটা ছোট্টো উদাহরণ যা মনে করাবে, যেকোনো সামান্য, নগন্য কাজে যুক্ত থাকা মানুষও তার এলিয়ে পড়ে থাকা জীবন থেকে মাথা উঁচু করে মানবিকতার পতাকা তুলে ধরতে পারেন।

কৃতজ্ঞতাঃ সোহেল আহমেদ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s